কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৮ জুন, ২০২৫ এ ০৮:৪৭ PM

হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) - শ্বাসতন্ত্র সংক্রমণের একটি নীরব জীবাণু

কন্টেন্ট: পাতা

ইমামুল মুনতাসির, মনজুর হোসেন খান, মোঃ ওমর কাইয়ুম, মোহাম্মাদ রাশেদুল হাসান, ক্য থোয়াই প্রু প্রিন্স, মাহবুবুর রহমান, তাহমিনা শিরীন;

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)

 

ভূমিকা

হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) শ্বাসতন্ত্র সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। মলিকুলার ডায়াগনস্টিক টেস্ট যেমন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR) এর উন্নতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জা বা রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (RSV) এর মতো অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের তুলনায় এইচএমপিভি কম পরিচিত ছিল। বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতায় যথেষ্ট অবদান রাখে। সম্প্রতি উহানে স্কুল বন্ধের গুজব এবং বেইজিং কর্তৃক এইচএমপিভি-সংক্রমণ বৃদ্ধির স্বীকৃতির পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণ হিসেবে ভাইরাসটিকে সবার দৃষ্টিগোচর করেছে। চীন এবং অন্যান্য দেশে এইচএমপিভি সংক্রমণ প্রত্যাশিত সীমার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও WHO স্বাভাবিক অবস্থার যে কোনও বিচ্যুতির জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

এই নিবন্ধে এইচএমপিভি-এর রোগতত্ত¡, লক্ষণ ও উপসর্গ, বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে এই রোগের প্রকোপ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

 

ভাইরোলজি এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য

হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস নিউমোভিরিনি উপগোত্র এবং মেটানিউমোভাইরাস গণের অন্তর্গত। এটি একটি আবৃত আরএনএ ভাইরাস যা দুটি সাবটাইপে (A1, A2, B1 এবং B2) এবং ছয়টি জেনেটিক বংশে (A1, A2a, A2b, A2c, B1 এবং B2) শ্রেণীবদ্ধ। এর গঠন এবং আচরণ RSV-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এদের বিবর্তনীয় উৎস একই।

 

সংক্রমণ

এইচএমপিভি সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মাঝে হাঁচি এবং কাশির নিঃসরণ থেকে, পারষ্পরিক ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, যেমন স্পর্শ করা বা হ্যান্ড শেক কিংবা দূষিত বস্তুর স্পর্শে সংক্রমিত হতে পারে। নাক, মুখ এবং চোখ জীবাণু প্রবেশের পথ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

রোগতত্ত্ব এবং রোগের প্রকোপ

এইচএমপিভি রোগের প্রকোপ লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাপী, এইচএমপিভি ২০১৮ সালে প্রায় ১১.১ মিলিয়ন তীব্র নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ঘটায়, যার ফলে ৫০০,০০০-এরও বেশি  রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং প্রায় ১১৩,০০০ জন মারা যায়। শিশু, বয়স্ক এবং যাদের দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদী রোগ (যেমনঃ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ ইত্যাদি), ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) এবং হাঁপানির মত অসুস্থতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে। RSV এর পরে শিশুদের নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হল এই ভাইরাস। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল এবং যারা দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকে তাদের এ ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হয়। ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এবং মৌসুমের সাথে এর আক্রান্তের হার পরিবর্তন হয়। নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে শীতকালে এবং বসন্তের প্রথম দিকে বেশি আক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলি মালয়েশিয়া, ভারত এবং কাজাখস্তানের মতো দেশগুলির বিভিন্ন অঞ্চলে ভাইরাসের ব্যাপক উপস্থিতি নির্দেশ করে। তবে এই বৃদ্ধিটি সাধারণ মৌসুমী রোগের প্রকোপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সাধ্যের বাইরে নয়।

বাংলাদেশে এইচএমপিভি

বাংলাদেশে প্রথম ২০০১ সালে ঢাকায় একটি সার্ভেইলেন্স এর মাধ্যমে এইচএমপিভি শনাক্ত করা হয়। ২০০৯ সাল থেকে হাসপাতাল-ভিত্তিক ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স (HBIS) সিস্টেম, ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এইচএমপিভি কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে। আইইডিসিআর-এর রেসপিরেটরি ইভেন্ট বেইজড সার্ভেইল্যান্স (REBS) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে এইচএমপিভি সনাক্ত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এইচএমপিভি জনিত কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালের মধ্যে পরিচালিত একটি প্রস্পেক্টিভ কোহোর্ট  সমীক্ষায় বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে এইচএমপিভি সংক্রমণের মলিকুলার রোগতত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়াও, একটি গবেষণায় ঢাকা শহরের ২০০ টি ৫ বছরের নিচের শিশুদের মাঝে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে ১৩% এইচএমপিভি ভাইরাস পজিটিভ।

 

লক্ষণ ও উপসর্গ

এইচএমপিভি সংক্রমণের লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহ উপরের শ্বাসতন্ত্রের হালকা লক্ষণ থেকে  নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ পর্যন্ত হতে পারে। সংক্রমণের ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। সাধারণ উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট, যা সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে, গুরুতর ক্ষেত্রে ব্রঙ্কিওলাইটিস, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) এর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ক্রমাগত জ্বর এবং পানিশূণ্যতার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পুনঃসংক্রমণ স্বাভাবিক ঘটনা এবং ১০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় সবাই ভাইরাসটির সংস্পর্শে আসে, যদিও এমন নয় যে একবার সংক্রামিত হলে সকলেই আজীবন সুরক্ষিত থাকে।

 

রোগ নির্ণয়

ভাইরাস বা এর অ্যান্টিবডি সনাক্তকরণই রোগ নির্ণয়ের একমাত্র সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হল রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (RT-PCR), যা ভাইরাল আরএনএকে সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করে। ইমিউনোফ্লুরোসেন্স অ্যাসে এইচএমপিভির অ্যান্টিবডি সনাক্ত করতে পারে এবং ইমিউনোফ্লুরোসেন্ট-অ্যান্টিবডি নাসা-গলবিলের ক্ষরণ থেকে এইচএমপিভি অ্যান্টিজেন সনাক্ত করতে পারে।

 

চিকিৎসা

বর্তমানে, এইচএমপিভি-এর জন্য কোনো অনুমোদিত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। ব্যাথা, জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের জন্য লক্ষণ-ভিত্তিক ঔষধ দেয়া হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে, হাসপাতালে ভর্তি এবং অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হতে পারে।

 

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

এইচএমপিভির বিস্তার রোধ সংক্রমণের চেইন ভাঙার উপর নির্ভর করে। ঝুঁকি কমানোর জন্য WHO বিভিন্ন পদক্ষেপের সুপারিশ করে:

- ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি: সাবান এবং পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা।

- শ্বাস-প্রশ্বাসের শিষ্টাচার: হাঁচি ও কাশির সময় নাক ও মুখ ঢেকে রাখা।

- মাস্ক পরিধান: জনাকীর্ণ বা বায়ু প্রবাহ কম এমন স্থানে মাস্ক পরা।

- বায়ুচলাচল: যে ঘরে একাধিক মানুষ থাকবে, সেখানে বায়ু প্রবাহ বাড়ানো।

 

উপসংহার

জনগণের এইচএমপিভি সম্পর্কে দিন দিন জ্ঞ্যান বৃদ্ধি সত্তে¡ও, এটি নানাবিধ ভুল তথ্যের  শিকার হচ্ছে। জনগণকে সচেতন করা উচিত যে এটি কোনো নতুন শ্বাসতন্ত্রের জীবাণু নয় এবং কমপক্ষে ১৯৫৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপ্তি হয়েছে। যদিও এটি সাধারণ জনগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসুস্থতা বা মৃত্যুহারের সাথে সম্পর্কিত নয়, তবে এটি উচ্চ-ঝুঁকি সম্পন্ন মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে। যেহেতু এই ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন বর্তমানে নেই, এর জনস্বাস্থ্যের প্রকোপ কমানোর জন্য নিয়মিত হাত পরিষ্কারের মত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার অনুসরণ করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন